Thursday, December 24, 2015

ফ্রীল্যান্সিং এ বাংলাদেশের অবস্থা !

ফ্রীল্যান্সিং এ বাংলাদেশের অবস্থা !


শুনলাম সরকার কিছু দিন আগে "ঘরে বসে বড়লোক" নামে আউটসোর্সিংকে সবার কাছে পৌছে দিয়ে সকলকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। নিঃসন্দেহে মহৎ উদ্যোগ। সরকারের তরফ থেকে এধরনের উদ্যোগ আরও আগেই নেওয়া জরুরী ছিলো। তবে, এই উদ্যোগ নেওয়ার আগে, কিছু জিনিস সম্ভবত আমাদের ভেবে দেখা উচিত ছিলো। 

ইন্টারনেট কানেকশন

আমিই একমাত্র ব্যাক্তি নই, যে ভালো মানের একটা ইন্টারনেট কানেকশন এর জন্য কান্নাকাটি করছে। আমি বাংলালায়ন এর ৫১২ কেবিপিএস আনলিমিটেড কানেকশন চালাই ( সাফারী কিং )। দিনের মধ্যে কয়েকবার করে কানেকশন যাওয়া আসা করে, আমাকে খেলার সাথী মনে করে লুকোচুরি খেলে। ৫১২ কেবিপিএস এর কানেকশনে, টেকনিক্যালী আমার পাওয়ার কথা, ৫১২/৮ = ৬৪ কিলোবাইট প্রতি সেকেন্ডে। এই লেখাটি যখন লিখছি, আমি ইউটিউবে একটা সাক্ষাৎকার দেখার চেষ্টা করছি, স্পিড মাত্র ২৫ কিলোবাইট প্রতি সেকেন্ড। কি কি হওয়া উচিৎ ছিলো, যেগুলো হচ্ছে না? 
  • আমি যখন ইন্টারনেট কানেকশন টা ক্রয় করছি, তখন বিক্রয়কারী প্রতিষ্টান এই মর্মে আমার কাছে বিক্রি করছে, যে তারা আমাকে সার্বক্ষণিক কানেকশন দেবে, এবং যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাই দেবে। তারা প্রতিষ্টান লাইসেন্স নেওয়ার সময় সেটাই অঙ্গীকার করেছে সরকার এর কাছে। 
  • আমি যদি এখন প্রতিশ্রুত স্পিড না পাই, সেটা সেবাদানকারী প্রতিষ্টান এর ত্রুটি। এবং তারা যদি সেই ত্রুটি সমাধান করতে না পারেন, সেটাও তাদের ব্যর্থতা। এবং সেক্ষেত্রে সরকারের উচিৎ ছিলো তাদের বিরুদ্ধে নিয়ম ভঙ্গ করার অভিযোগ এনে আইনী কার্যক্রম চালানো। 
অজ্ঞাত কারনে, বাংলালায়ন প্রায় বিগত ২ বছর ধরে ধজভঙ্গ মার্কা কানেকশন দিয়ে যাচ্ছে, হাজার হাজার অভিযোগ করা হচ্ছে, কোন প্রতিকার নেই। এবং আমিই প্রথম ব্যাক্তি নই, যিনি এ নিয়ে আওয়াজ তুলেছেন। একই অভিযোগ প্রায় সবগুলো ওয়াইম্যাক্স কিংবা জি এম এম মতান্তরে থ্রিজি অপারেটর এর জন্য প্রযোজ্য। 
থ্রিজি আসার সময় আমরা সকলেই প্রচন্ড এক্সাইটেড ছিলাম, যাক অবশেষে ভালো কানেকশন পাবো আমরা, স্পিড ওঠা নামা করবে না, সব খানে কানেকশন থাকবে, ভালো স্পিড থাকবে। যা চেয়েছিলাম, তাহা তো পেলাম না গুরু, যা পেলাম, তা আর হজম হলো না। স্পিড ওঠা নামা করার বদলে একবার টুজি থেকে থ্রিজি, আবার থ্রিজি থেকে টুজিতে লাফালাফি করে নেটওয়ার্ক। অনেক যায়গাতেই নেটওয়ার্ক থাকে না থ্রিজির। স্পিড ভালো থাকলেও, মাশাল্লাহ যা দাম দিয়েছে, তাতে থ্রিজিই এখন দূর্লভ রত্ন। 
প্রযুক্তিতে যদি উন্নতি করতে হয়, ভালো ইন্টারনেট কানেকশন দিতে হবে। এবং এর কোন বিকল্প নেই। একজন হবু ফ্রীল্যান্সার, সে শিখতে চায়। কিন্তু ধজভং কানেকশন নিয়ে সে শেখা তো দূরে থাক, তার ক্রমাগত মন উঠে যেতে থাকে। তার ওপরে কানেকশন এর যা দাম, একজন ছাত্রের পক্ষে তা বহন করা আসলেই কঠিন। 
মার্কেটপ্লেস থেকে যখন একজন ক্লায়েন্ট কোন কাজের জন্য ইন্টারভিউ নেয়, তখন কখনো স্কাইপে ভয়েস কল করে, কখনো ভিডিও কল করে। কখনো বা কোন ইউটিউব ভিডিও দেখতে দেয়, কোন কিছু ভালো ভাবে বুঝে নেওয়ার জন্য। এখন এসব করার উপযোগী কানেকশনই যদি আমাদের না থাকে, ক্লায়েন্ট এর কাছ থেকে কাজ আনবোই বা কিভাবে, আর করবোই বা কিভাবে? 

কমিউনিকেশন স্কিল 

তথ্য প্রযুক্তির যে কোন শাখায়, সেটা সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন হোক, কিংবা গ্রাফিক্স ডিজাইন হোক, কিংবা ওয়েব ডেভেলপমেন্টই হোক না কেন, সর্ব প্রথম যেটা প্রয়োজন, সেটা হলো কমিউনিকেশন স্কিল। ক্লায়েন্ট কি বলছে, সেটা বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে, সেটা বুঝে উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। আবার শেখার ক্ষেত্রে, আমি বিশ্বাস করি, ইন্টারনেট এর চেয়ে বড় শিক্ষক আর কেউ নেই। আর সেই শিক্ষক এর কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করতে হলে, ইংরেজিতে অবশ্যই এবং অবশ্যই দক্ষ হতে হবে। ইংরেজিতে একটা কনভার্সেশন চালিয়ে যাবার দক্ষতা থাকতে হবে। 
আমি প্রচুর ফ্রীল্যান্সার দেখেছি, যারা ক্লায়েন্ট কি চাইছে সেটা না বুঝেই জবে অ্যাপ্লাই করে বসে আছে, ফলাফল, কাজটা সে ঠিকমতো করতে পারছে না, কমিউনিকেশন এর ঘাটতি হচ্ছে, এবং ক্লায়েন্ট রেগে গিয়ে আর কোন বাংলাদেশীকে কাজ দেবো না বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছে। অনেকে আমাকে ফেসবুকে স্ক্রিনশট দিয়ে জানতে চান, এইখানে আসলে ক্লায়েন্ট কি বলেছে। মাঝে মাঝে দুই একজনকে উত্তর দেই, যাদের ক্ষেত্রে দেখি ক্লায়েন্টের জবাব আসলেই একটু প্যাঁচানো। অন্যদের ওপর রাগ হয়। ( এটা আমার ব্যাক্তিগত বিষয় ) 
উদাহরন স্বরূপ বলা যেতে পারে এই ভদ্রলোকের কথা, যিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, কোন বাংলাদেশী, পাকিস্তানী বা ইন্ডিয়ানকে কাজ দেবেন না। ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানীরা জাহান্নামে যাক, আমার কিছু আসে যায় না, কিন্তু আমার দেশের নাম যখন আসে, তখন আমারও খারাপ লাগে। 
দুই চারজন চোর ছ্যাঁচড়ার কথা বাদ দিলে, বাকি দোষটা পুরোটাই কমিউনিকেশন স্কিল এর ঘাটতির। না বুঝে কাজে বিড করা এবং কাজ আনা, এবং শেষে গিয়ে সব কিছু লেজে গোবরে করে ফেলা। 
নতুন ফ্রীল্যান্সার তৈরীর আগে, তাদের কমিউনিকেশন স্কিল নিয়ে কাজ করতে হবে সরকারকে। নতুন দু-চারশো ফ্রীল্যান্সার তৈরীর তালে যদি বিশাল একটা মার্কেটপ্লেস আমাদের হাত ছাড়া হয়ে যায়, তাহলে দোষ কে নেবে? 

আগাছা এভ্রিহোয়্যার

কয়েকদিন আগে দেখলাম, একটা সংগঠন ( নাম নিচ্ছি না ) মাত্র আট দিনের ট্রেনিং দিয়ে একজন ফ্রীল্যান্সার তৈরী করেছে, এবং সে নাকি অলরেডি মার্কেটপ্লেস থেকে একটা কাজও পেয়ে গেছে। সেই প্রতিষ্টান থেকে মাসে ৩০-৪৫ হাজার টাকা ইনকামের গ্যারান্টিও দেওয়া হচ্ছে। বলিহারী যাই, সত্যিই বলিহারী যাই। 
ইন্টারনেট এর একজন পাওয়ার ইউজার হতেও একজন মানুষের চার পাঁচ মাস সময় লাগে। সেখানে একজন ফ্রীল্যান্সার তৈরী করতে মাত্র আট দিন লাগে, কিভাবে সম্ভব? সম্ভব এক ভাবেই। শর্টকাট। তাকে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে, ক এর পর খ লিখবা, এরপর গ। তাহলেই কেল্লা ফতে, ডলারে তোমার পকেট ভারী হয়ে যাবে। 
কথা ভুল না, ডলারে পকেট ভারি হওয়ার সম্ভবনা তো আছে বটে, তবে ক এর পর যদি গ চলে আসে, তাহলে এই ব্যাক্তি কি করবেন, প্রশ্ন হলো সেটাই। এরকম কেউ যদি লেখাটা পড়েন, তাদের হয়তো খারাপ লাগবে, কিন্তু সত্যিটা হলো, বাংলাদেশে কয়েকটা প্রতিষ্টান ছাড়া, বাকি সব ফ্রীল্যান্সার ট্রেনিংই এই ক এর পর খ টাইপ। যারা নিজেরা এই ফিল্ড এ শাইন করেছে, অনেক বছরের অভিজ্ঞতা আছে, তারাই শুধু ট্রেইনার হিসাবে সঠিক গাউডলাইন দিতে পারবে। নিজে কাজ করেছে দুইটা, আবার ট্রেনিং ও দিচ্ছে, এইরকম লোকের কাছে গেলে হয়তো শর্টকাট শিখতে পারবেন, ধরা পরে খেতেই হবে। 
বাংলাদেশের নাম খারাপ হওয়ার পেছনে এই ধরনের ট্রেনিং ইন্সট্রিটিউট এর হাত অনেকখানি। এরা সবাইকে ইনকাম করার প্রমিস করছে, তাদের বেহুদা ট্রেনিং দিচ্ছে, তারা মার্কেট প্লেসে গিয়ে খুব অল্প বিড করা কাজ আনছে। যেমন নিচের এই ভদ্রলোকের কথাই ধরি, 
উনি নিজের সার্ভিস কি দামে বিক্রি করবেন, সেটা তার ব্যাক্তিগত ব্যাপার। আমার তাতে কিছু আসে যায়না। কিন্তু উনার এই অল্প দামে অধিক কাজের থিওরীর কারনে, সাফার করছে বাকিরা। 
আমি একটা কাজে ১৪৫ ডলার বিড করেছিলাম। কাজটা কি সেটা মূখ্য না, মূখ্য হলো, ক্লায়েন্ট আমাকে বলে, এই রকমই তো একটা কাজ তোমার দেশের একটা ছেলে ৩০ ডলারে করে দিছে। তুমি প্রায় ৫ গুন বেশী চাইতেছ কেন? 
কথা হলো, আমি আমার প্রফিট রেখেই বিড করেছি। তার মানে এই নয় যে কাজটা আসলেই ৩০ ডলারে করা সম্ভব। আমি কাজটা পরে করিনি। কারন এতো কম রেটে করা সম্ভব ছিলো না। সাথে বেশি দেশী ব্যাটার ওপরে সেই রকম মেজাজ খারাপ হয়েছিলো। নিজেতো কম রেটে কাজ করেছে, সেটার জন্য আমাদেরও সাফার করতে হচ্ছে। এখন সরকারের তো আর আইন করা সম্ভব নয় যে মার্কেটপ্লেসে কেউ কম বিড করতে পারবে না। যেটা করতে হবে, এদের ট্রেনিং দিয়ে এদের স্কিলের সাথে সাথে মানসিকতাটাও উন্নত করতে হবে। এবং এটা সরকারের দ্বায়িত্ব, এইসব আগাছা প্রতিষ্টান এর সঠিক যত্ন নেওয়া। মানে এদের সোজা বাংলা সাইজ করা। সানডে মানডে ক্লোজ। 

সত্যটা কি? 

আসলে এতোক্ষন যা লিখলাম, সবই জানা বিষয়। তবে এগুলো প্রতিকার নয়। ফ্রীল্যান্সিং এর অনেক ফিল্ড এর মধ্যে, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক্স ডিজাইন, সার্ভার অ্যাডমিনিষ্ট্রেশ্ন, এগুলো ক্রিয়েটিভ ফিল্ড। এই ফিল্ড গুলোতে কাজ করার জন্য ক্রিয়েটিভিটি দরকার। নতুন কিছু শেখার আগ্রহ দরকার, পুরোনো বিদ্যা ঝালাই করার ধৈর্য্য থাকতে হবে। টাকা পয়সা ইনকামের ধান্দা নিয়ে যদি এই ফিল্ডে কেউ আসে, সে হয়তো কিছু কাজ করতে পারবে। কিন্তু দিনের শেষে, সে ভালো একজন ফ্রীল্যান্সার হবে, ভালো একজন প্রোগ্রামার নয়। এখন সরকারের এই পোগ্রাম এর উদ্দেশ্যটাই যদি হয়ে থাকে স্রেফ বৈদেশিক মূদ্রা আনা আর কর্মসংস্থান করা, তাহলে আপনারা ঠিক পথেই আগাচ্ছেন। কর্মসংস্থান করছেন বটে, তবে সেটা সাময়িক, ২ বছর পরে এই ফিল্ড থেকে বাংলাদেশের নাম মুছে যাবে, এটা ষ্ট্যাম্প পেপারে লিখে গ্যারান্টি দেওয়া যায়। নিম্ন মানের কাজ, খারাপ কমিউনিকেশন স্কিল, দূর্বল নেট কানেকশন আর মাথার ওপরে চেপে যাওয়া আগাছাই এই ফিল্ড থেকে আমাদের টেনে নামাবে। 
আর যদি চান যে বৈদেশিক মূদ্রার পাশাপাশি সত্যিকার এর একদল ফ্রীল্যান্সার তৈরী করবেন, যারা জেনে কাজ করবে, বুঝে কাজ করবে, কাজ করার জন্য কাজ করবে। তাহলে এখনো সময় আছে, অবকাঠামোর দিকে নজর দিন। এই ফিল্ড এমনিতেই ইভলভ করবে। এর জন্য শুধু দরকার ভালো ইন্টারনেট কানেকশন, আর আগাছা গুলো থেকে মুক্তি। সরকার এইটুকু পদক্ষেপ আমাদের শুধু বৈদেশিক মুদ্রাই এনে দেবে না, দেশের একটা বড় বেকার জনশক্তির কর্মসংস্থান হবে। 
- See more at: http://tech.priyo.com/blog/2014/6/24/2F632.html#sthash.H46tDpUS.dpuf

0 comments:

Post a Comment

Advanced Search

Find Us On Facebook

Android Route

Your Info

Flag Counter
Android Tutorial ™. Powered by Blogger.